কার্ট

সব বই লেখক বিষয়

বিষয় লিস্ট

সুধীর চক্রবর্তী এর দ্বিরালাপ

এক নজরে

মোট পাতা: 414

বিষয়: স্বাক্ষাৎকার

** বইটি ডাউনলোড করে পড়তে আপনার সেইবই অ্যাপটি ব্যবহার করুন।

সুধীর চক্রবর্তী আর কাজল মিত্র

 

কাজল : আপনি কি বরাবরের কৃষ্ণনাগরিক?

সুধীর : আমার জন্ম এ শহরে নয়। শিবপুর হাওড়ায় ১৯৩৪ সালে আমি জন্মেছি। সেখানে আমার বাবার বাসাবাড়ি ছিল। বাবা কলকাতায় ব্রিটিশ সরকারের চাকরি করতেন। কিন্তু যখন যুদ্ধ হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, হঠাৎ কলকাতায় বোম পড়ল তখন আমরা শিবপুর থেকে সবাই পালিয়ে এলাম দিগনগর নামক গ্রামে, যেটা হচ্ছে আমাদের বাস্তুভিটে। এখানে একদা আমার ঠাকুরদা’র এবং তাঁর পূর্বপুরুষের জমিদারি ছিল। কাজেই সেই পুরোনো সাবেক বাড়িতে এসে আমরা আশ্রয় নিলাম। কিন্তু ওখানে আমাদের একবছর থাকাকালীনই সবাই ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলাম এবং দেখা গেল ওখানে একটামাত্র অনুন্নত প্রাইমারি স্কুল ছাড়া পড়ার বা লেখাপড়ার ভদ্ররকমের উচ্চতর কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে বাবা অচিরে দিগনগরের বাড়ি ছেড়ে কৃষ্ণনগর চলে এলেন একটা বাড়ি কিনে, ধোপাপাড়ায়। আমরা ভর্তি হলাম দেবনাথ স্কুলে। কারণ আমাদের ওই সময় এটা স্বাভাবিক ছিল যে, পাড়ার কাছাকাছি যে স্কুল আছে সেখানেই ভর্তি হওয়া। যেমন দক্ষিণ কৃষ্ণনগরের বেশির ভাগ ছাত্র এ.ভি স্কুলেই পড়ত। তেমনি এদিকে আমাদের ধোপাপাড়া, ছুতোরপাড়া বা গোলাপটির বেশিরভাগ ছেলেরা সব দেবনাথ স্কুলেই পড়ত। কাজেই বাবা আমার তিন দাদাকে ওই স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। সেটা ১৯৪২ সাল। আমি অবশ্য তখন ভর্তি হইনি। আমি ’৪৬ সালে যখন ক্লাস সিক্স স্ট্যান্ডার্ডে বাড়িতে পড়াশুনা শেষ করেছিলাম তখন স্কুলে ভর্তি হই। তখন দেবনাথ স্কুলকে সবাই বলত গোয়াল। তা গোয়ালের গরু হিসেবে আমরা খুব একটা খারাপ ফল করিনি জীবনে। আমি আর সহপাঠী মোহিত রায় হাতে লেখা পত্রিকা করতাম। তখন শহরের অভিজাত স্কুল বলতে কলেজিয়েট স্কুল বোঝাত। অভিজাত মানুষের বা বড়লোকের ছেলেরা পড়ত সেখানে। অফিসারদের ছেলেরা পড়ত সেখানে। সি.এম.এস স্কুল খ্রিস্টান মিশনারি স্কুল। ওখানে অনেক ভালো ছেলে পড়ত। সারা শহরেই সি.এম.এস স্কুল এবং কলেজিয়েট স্কুলের খুব সুনাম ছিল। কিন্তু দেবনাথ স্কুলের সুনাম ছিল জিমন্যাস্টিকস-এ, খেলাধুলায়। ফুটবল টিম খুব ভালো ছিল। আসলে এখন ইংরেজিতে যেটাকে ইনফ্রাস্ট্রাকচার বলে সেটা দেবনাথ স্কুলে খুব একটা ছিল না। মনে আছে, আমাদের ক্লাস রুমের দরজাও ছিল না। ফলে ওখানে নিম্নবর্গ বা নিম্নমধ্যবিত্তদের ছেলেরাই পড়ত। এজন্য পড়াশুনার স্ট্যান্ডার্ড যে খুব ভালো ছিল তা নয়। কিন্তু মাস্টারমশাইদের তৎপরতা ছিল, চেষ্টা ছিল। যদিও আন্দাজ করতে পারি, তাঁদের বেতনক্রম ছিল খুবই নিম্নস্তরের। ওই স্কুল থেকে তবু ভালো ফলাফল হয়েছে এমন অনেক ঘটনাই আছে। যেমন আমার দুই দাদা তো ফার্স্ট ডিভিশনেই পাশ করেছিলেন।

যখন আমরা এখানে আসি তখন যে এখানে প্রাথমিক স্কুল খুব বেশি দেখেছি তা মনে হয় না। কিন্তু মাধ্যমিক স্কুল কয়েকটি ছিল। তার মধ্যে একটা দেবনাথ, একটা সি.এম.এস, একটা কলেজিয়েট, একটা এ.ভি স্কুল। আর কৃষ্ণনগর হাইস্কুল এখন যেটাকে বলা হয়, তখন সেটাকে বলা হত মুসলিম স্কুল। এগুলিই প্রধান স্কুল ছিল। স্বাধীনতার পর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল হয়েছে। তার কিছু আগে বোধহয় লেডি কারমাইকেল গার্লস। তারও আগে মৃণালিনী। স্কুলের লেখাপড়ায় আমাদের সেই সময় ম্যাট্রিক পরীক্ষায় খুব স্ট্যান্ড স্ট্যান্ড করেছে এমন ঘটনা বিশেষ ঘটেনি। কিন্তু আমরা যখন একটু সিনিয়র ক্লাসে উঠেছি ফিফটিজে অর্থাৎ পঞ্চাশের দশকে আমাদের এখানে রেজাল্ট ভালো হতে আরম্ভ করে। তারপর থেকেই ক্রমে আমাদের শহরে ও পরিপার্শ্বে লেখাপড়ার চর্চা খুব বাড়ে। তার কারণ দেশভাগ ও উদ্বাস্তুদের আগমন। তাদের লেখাপড়ার জন্য নতুন নতুন শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠে। স্কুল জীবনের স্মৃতি বলতে যেটা বিশেষ করে মনে পড়ে যে পরাধীন ভারতে একটা পা আর স্বাধীন ভারতে একটা পা তখন আমাদের। যখন ক্লাস সেভেনে উঠেছি তখন দেশে স্বাধীনতা আসে। কৃষ্ণনগর বলাবাহুল্য সেই উত্তেজনার মধ্যে একটু যেন বেশিই ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু সারা শহরে আমাদের ছাত্রজীবনে একটা দেশাত্মবোধের আবহাওয়া ছিল। অনেক ত্যাগী দেশসেবক, নিঃস্বার্থ স্বেচ্ছাসেবক শহরে ছিলেন। যাঁদের দেখলে প্রেরণা জাগত। বিশেষ করে ২৩শে জানুয়ারি খুবই উদ্দীপনা হত এবং বিশাল মিছিল বেরত। ধরা যাক এ.ভি স্কুলের মুখ থেকে যদি একটা মিছিল বেরত তা নদী পর্যন্ত চলে যেত। তাতে ব্যান্ড পার্টিও থাকত। আমাদের শহরে ব্যান্ডপার্টি ছিল। তারা বাজাত ‘কদম কদম বঢ়ায়ে যা’। ২৬শে জানুয়ারি নানা অনুষ্ঠানে ও সমাবেশে জাতীয় পতাকা তুলে আমাদের স্বাধীনতা দিবসের সংকল্প নেওয়া হত। স্কুলে আমাদের প্রত্যেক বছর ২৬শে জানুয়ারি জাতীয় পতাকা তোলা হত। স্কুলের সেক্রেটারি ছিলেন সুধীন মৌলিক মশায়। তিনি সেক্রেটারি হিসাবে একবার ভাষণ দিচ্ছিলেন যা আমার এখনও খুব মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘শোন, তোমরা তোমাদের যে খাতা বই সব আছে তাতে নিজেদের নাম ইংরেজি হরফে লিখবে না। This book belongs to এভাবে কোনো স্বাধীন দেশের লোক স্বাধীন মনস্ক মানুষ অন্য দেশের লিপিতে তার নিজের নাম লেখে না। তোমরা বাংলা অক্ষরে সগর্বে নিজেদের নাম লিখবে।’ সেই থেকে আজ পর্যন্ত আমার সমস্ত বই-এ খাতায় আমি বাংলা অক্ষরে লিখে থাকি আমার নাম। সবাইকে লিখতে উদ্বুদ্ধ করি। তাতে যে খুব সবাইকে সাড়া দেওয়াতে পেরেছি তা মনে হয় না। তার কারণ চোখের সামনেই তো দেশটা সাহেবিয়ানার চাকর বনে গেল।

প্র: আপনার অধ্যাপনা পর্ব সম্পর্কে কিছু বলুন।

উ: তা যাই হোক। শহরে অধ্যাপনার ব্যাপারটা বলি-কৃষ্ণনগর কলেজ থেকে আমি ৫৫ সালে বি.এ পাশ করি। ৫১-৫৫ ফার্স্ট ইয়ার থেকে ফোর্থ ইয়ার পর্যন্ত পড়ে বি.এ পাশ করে আমি যাই কলকাতায় পড়তে। কলকাতায় দু’বছর এম.এ পড়ি। পরীক্ষার ফলাফল বেশ ভালো হয়েছিল। আমি কলকাতাতেই চাকরিতে ঢুকে পড়ি। বড়িশা বিবেকানন্দ কলেজে। সেটা ছিল একটা স্পনসর্ড কলেজ যেখানে একদা জীবনানন্দ দাশ পড়াতেন। কিন্তু আমার লক্ষ্য ছিল সরকারি কলেজ। ফলে পাবলিক সার্ভিস কমিশন যখন বিজ্ঞাপন দিল আমি দরখাস্ত করলাম এবং ইন্টারভিউ দিয়ে নির্বাচিত হলাম। কর্তৃপক্ষ বললেন, আমার মনোনয়ন হয়েছে এক নম্বরে। প্রেসিডেন্সি, দার্জিলিং এবং কৃষ্ণনগর তিনটি কলেজে ভ্যাকান্সি আছে। কোনটায় আপনি যাবেন? আমি বললাম আমি কৃষ্ণনগর কলেজে যাব। তিনি চমকে উঠে বললেন সে কি? আপনি প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াবেন না? তখন তাঁকে আমি বললাম, দেখুন আমি যখন কৃষ্ণনগর কলেজে পড়তাম তখন মনে মনে ভাবতাম যে, এই কলেজে জীবনে যেন পড়াতে পারি অন্তত একবার। সেই সুযোগটা আজ আমি পেয়েছি। পরে না হয় অন্য কোথাও যাওয়া যাবে।

১৯৬০ সালের ৩ মে আমি কলকাতার কলেজের কাজ ছেড়ে কৃষ্ণনগর কলেজে যোগদান করি এবং একটানা ৭৬ সাল পর্যন্ত এই পদে ছিলাম। ষোল বছর। তারপর আমার পদোন্নতি হয়। বিভাগীয় প্রধান হিসেবে চন্দননগর কলেজে যোগ দিই ৭৬ সালে। সেখান থেকে ৮৩ সালে যেদিন আবার প্রস্তাব উঠল ট্রান্সফারের, কর্তৃপক্ষ জিজ্ঞাসা করলেন আপনি কোথায় যেতে চান—প্রেসিডেন্সিতে যেতে পারেন, উত্তরবঙ্গে যেতে পারেন ভ্যাকান্সি আছে। আমি জানালাম আমি কৃষ্ণনগরেই ফিরে যেতে চাই। তাঁরা আমার কথা রাখলেন। ৮৩ সালে আমি আবার কৃষ্ণনগর কলেজে যোগ দিলাম। এইখানে বলে রাখি যে, নিজের শহরের কলেজে যোগ দেবার সময়ে একটি গোপন সংকল্প নিয়েছিলাম নিজের সম্পর্কে। তা এই যে, এ শহরে আমি থাকব নিজেকে গুটিয়ে। কোনো নেতৃত্ব বা সংগঠনে বা রাজনৈতিক দলে যাব না। যাকে বলে একেবারে low key profile-এ থাকা। তাতে ভালোই হয়েছে। এখানে একাদিক্রমে ৯৪ সাল পর্যন্ত পড়িয়ে আমি অবসর পেয়েছি। অবসরের পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে দু’বছর অতিথি অধ্যাপক হই তাঁদের আমন্ত্রণে। তবে কৃষ্ণনগর কলেজের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব দীর্ঘ। এখানে আমি পড়েছি চার বছর পুরো এবং পড়িয়েছি দীর্ঘদিন, মানে সাতাশ বছর। ফলে এই শহরে এখনও একটা বিশাল ছাত্র সম্প্রদায় আছে আমার। সেই প্রাক্তন ছাত্ররা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গর্ব এবং গৌরব। এই কলেজে থাকাকালীন আমার জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। অনেক বিখ্যাত ছাত্র এবং ছাত্রী এখান থেকে বেরিয়েছে। যেমন ধরা যাক ক্ষুদিরাম দাসের মেয়ে বাণীমঞ্জরী দাস, সে আমাদের কলেজ থেকেই ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছিল। যেমন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাস আমাদের ছাত্র ছিল। আমার সঙ্গে বেশ ভালোই সম্পর্ক ছিল মৃত্যুকাল পর্যন্ত। মাঝে মাঝেই আমাকে চিঠি দিত, আমার লেখা পত্র সম্পর্কে উৎসাহ প্রকাশ করত। কিন্তু কখনও তাঁর কাছ থেকে বাড়তি সুযোগ নিইনি। তার প্রয়াণে আমি ব্যথিত হয়েছি। এমন অনেক ছাত্রছাত্রীর কথাই মনে পড়ে। সবচেয়ে যেটা মনে পড়ে, আমার অধ্যাপনা পর্বে কৃষ্ণনগর শহরে কৃষ্ণনগর কলেজ পত্রিকাকে ঘিরে একটা স্বতন্ত্র ধারার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। প্রচুর ছেলেমেয়ে, বিশেষ করে ছেলেরা, কৃষ্ণনগর কলেজ পত্রিকাকে ঘিরে তাদের সাহিত্য সাধনার একটা সূচনা ঘটিয়েছিল। আমি ছিলাম তাদের উৎসাহদাতা। ‘সমবায় মুদ্রণী’তে তখন কলেজ পত্রিকা ছাপা হত। প্রুফ দেখা হত। পত্রিকার মান ছিল অত্যন্ত উন্নত। নানান সাহিত্য বিতর্ক রাজনীতির বিতর্ক সেখানে উঠত। আমাদের ছাত্রদের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিল বেশ অনেকেই। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পরবর্তীকালে রাজনীতির পথে বিখ্যাত হয়েছে, তাত্ত্বিক বা কর্মী হিসেবে নাম করেছে। সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য, দীপক বিশ্বাস, শচীন চক্রবর্তী, এরকম অনেকেই ছিল। দেবদাস আচার্য, প্ৰাণেশ সরকার, সঞ্জীব প্রামাণিক, শতঞ্জীব রাহা, অপূর্ব দত্ত, ধীরেন দেবনাথ, জগৎ লাহা আমার ক্লাশে সাহিত্যের পাঠ নিয়েছে। পরবর্তীকালে রাজ্যের আইনমন্ত্রী নিশীথ অধিকারী আমার ক্লাশে বাংলা অনার্স পড়েছে, এখবর অনেকে জানেন না। সমরজিৎ সেনগুপ্ত, অসীম চক্রবর্তী, প্রীতিশ সিংহ, দীপক বিশ্বাস, জিতেন আচার্য, শ্যামল রায় এরা সব ছিল নানা সময়ে আমাদের পত্রিকার সম্পাদক। এই কৃষ্ণনগর কলেজ পত্রিকাকে ঘিরে বাংলা সংস্কৃতির একটা বড় অংশ আছে বলে মনে করি। যদিও সেই পত্রিকা গ্রন্থাগারিকদের অর্ধমনস্কতায় তেমন করে সংরক্ষিত করা হয় নি। কৃষ্ণনগর কলেজ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা ১৯২৫ সালে বেরোয়। প্রথম সম্পাদক ছিলেন হেমন্তকুমার সরকার। ঐ সময়কার বেশ ক বছরের কলেজ পত্রিকার মূল্যবান ও ঐতিহাসিক প্রথম দুটো ভল্যুম লাইব্রেরি থেকে অসতর্কতার জন্যে হারিয়ে গেছে। তাতে প্রথম দশটি সংখ্যা ছিল। অসতর্কতা এই যে, যে বই issue করার আইন নেই, তা গ্রন্থাগারিকের খামখেয়ালে একজন ছাত্রকে issue করা হয়। ছাত্রটি আত্মহত্যা করে এবং বহু চেষ্টাতেও ভল্যুম দুটি উদ্ধার হয়নি। ফলে কৃষ্ণনগর কলেজ ম্যাগাজিনের যে সুদীর্ঘ ঐতিহ্য ও ইতিহাস তা সূচনাতেই নষ্ট হয়ে গেছে।

প্র: কলেজ জীবনের কথা কিছু বলবেন? 

সংশ্লিষ্ট বই

পাঠকের মতামত
রিভিউ লিখুন
রিভিউ অথবা রেটিং করার জন্য লগইন করুন!