logo
0
item(s)

বিষয় লিস্ট

ড.অপূর্ব বিশ্বাস এর ঋতুসঙ্গীতে রবীন্দ্র-কবিমানস

ঋতুসঙ্গীতে রবীন্দ্র-কবিমানস
এক নজরে

মোট পাতা: 358

বিষয়: গবেষণা

প্রথম পরিচ্ছেদ

 

গ্রীষ্ম

 

গীতবিতানে গ্রীষ্মের গানের স্বল্পতা চোখে পড়ে, মাত্র ১৬টি গান পেয়েছি আমরা। এছাড়া গ্রীষ্মানুষঙ্গে প্রেম পর্যায়ে ৩টি, পূজা পর্যায়ে ১টি এবং বিচিত্র পর্যায়ে ১টি গান পাওয়া গেছে। রবীন্দ্রনাথের প্রধান গ্রীষ্মের গানগুলি তাঁর ৬০ থেকে ৬৫ বছর বয়সের মধ্যে লেখা। পরিণত প্রৌঢ়ের নিরাসক্ত দৃষ্টির পরিচয় মেলে তাই এই গানগুলিতে। গ্রীষ্মের গানে ছবি কক্ষ, তাও বর্ণহীন। বেশির ভাগ গানেই বিবর্ণ প্রকৃতি, বাণীর সুমিত প্রয়োগ—মনে হয় তাঁর পরিণত বয়সের জীবনবৃত্তের সঙ্গে সংলগ্ন। এ প্রসঙ্গে শ্রীসরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য—“সেই তন্মাত্র এবং স্কেলিট্যাল, সেই কঠিন এবং অনুচ্ছ্বসিত, চিত্রভূমির সঙ্গে যে কবির পরিচয় তখন নিবিড় হয়ে উঠেছে—গ্রীষ্মের গানগুলি তাঁরই রচনা”। এ গানগুলির প্রতিমা নির্মাণের অভিনবত্বও আমাদের নিয়ে যায় রবীন্দ্রচিত্রকলার দিকে। জটিল কেশে ঢাকা আকাশ, পিঙ্গল জটার দীপ্তি, কঠিনের ক্রূর বক্ষতল প্রভৃতি চিত্রকল্প গ্রীষ্মের অনির্বচনীয় রহস্যময় রূপকে আভাসিত করছে। লক্ষণীয় এই যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে গ্রীষ্ম ছাড়া বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত এবং বসন্তকে সম্বোধন করেছেন, বর্ণনা করেছেন, তাদের ঋতু-নামেই। কেবল গ্রীষ্মের গানে কোথাও ‘গ্রীষ্ম’ বলে সম্বোধন নেই, সর্বত্রই বৈশাখ বলেছেন। সম্ভবতঃ ‘গ্রীষ্ম’ শব্দটি তেমন সুখশ্রাব্য মনে হয়নি তাঁর। অথবা হয়তো বৈশাখেই গ্রীষ্মের অন্তঃস্বভাবটি সার্বত্রিকভাবে ধরা পড়ে বলে মনে হয়েছিল তাঁর। গ্রীষ্মের নামোল্লেখ না করলেও কিন্তু তিনি গ্রীষ্মের প্রতি বিরূপ ছিলেন এমন কোনো প্রমাণ মেলে না। ১৯৩৫-এর ৭ই এপ্রিল ইন্দিরা দেবীকে একটি চিঠিতে লিখছেন—“আমি নিজে গরম সম্বন্ধে অসহিষ্ণু নই। পঁচিশে বৈশাখের নিমন্ত্রণে এসেছি জগতে।” আবার ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৬, লিখেছিলেন রাণু অধিকারীকে—“সমস্ত আকাশটা যেন তৃষ্ণার্ত কুকুরের মতো জিব বের করে হাঃ-হাঃ করে হাঁপাচ্ছে। আর এই যে দুপুরবেলাকার হাওয়া, এ যে কী রকম, সে তোমাকে বেশি বোঝাতে হবে না—এই বললেই বুঝবে, যে এ প্রায় বেনারসি হাওয়া, আগুনের লকলকে সুতো দিয়ে আগাগোড়া ঠাস বুনোনি, দিক-লক্ষ্মীরা পরেছেন,......। আমি কিন্তু আমার ঐ আকাশের ভানুদাদার দূতগুলিকে ভয় করিনে, এই দুপুরে দেখবে, ঘরে ঘরে দুয়ার বন্ধ কিন্তু আমার ঘরের সব দরজা-জানলা খোলা। তপ্ত হাওয়া হুহু করে ঘরে ঢুকে আমাকে আগাগোড়া ঘ্রাণ করে যাচ্ছে”

রবীন্দ্রনাথ কিভাবে গ্রীষ্মের স্বরূপ উপলব্ধি করেছিলেন তার পরিচয় রয়েছে কল্পনাকাব্যের ‘বৈশাখ’ কবিতায়। কবিতাটি ১৩০৬-এ রচিত।

“হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ।

ধূলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল,

তপঃক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণ ভয়াল

কারে দাও ডাক

হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ।

 

ছায়ামূর্তি যত অনুচর

দগ্ধতাম্র দিগন্তের কোন ছিদ্র হতে ছুটে আসে।

কী ভীষণ অদৃশ্য নৃত্যে মাতি উঠে মধ্যাহ্ন-আকাশে

নিঃশব্দ প্রখর

ছায়ামূর্তি তব অনুচর।

 

মত্তশ্রমে শ্বসিছে হুতাশ।

রহি রহি দহি দহি উগ্রবেগে উঠিছে ঘুরিয়া,

আবর্তিয়া তৃণপর্ণ, ঘূর্ণছন্দে শূন্যে আলোড়িয়া

চূর্ণরেণুরাশ

মত্তশ্রমে শ্বসিছে হুতাশ।

 

দীপ্তচক্ষু হে, শীর্ণ সন্ন্যাসী।

পদ্মাসনে বস আসি রক্তনেত্র তুলিয়া ললাটে,

শুষ্কজল নদীতীরে শস্যশূন্য তৃষাদীর্ণ মাঠে

উদাসী প্রবাসী,

দীপ্তচক্ষু হে শীর্ণ সন্ন্যাসী।

সংশ্লিষ্ট বই

পাঠকের মতামত
রিভিউ লিখুন
রিভিউ অথবা রেটিং করার জন্য লগইন করুন!