logo
0
item(s)

বিষয় লিস্ট

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এর জীবন যখন যেমন

জীবন যখন যেমন
এক নজরে

মোট পাতা: 373

বিষয়: ব্যবসা

বিধবা পল্লীর বোবা কান্না

 

শেরপুর জেলার কাকরকান্দিতে কৃষি ব্যাংকের একটি নতুন শাখা উদ্বোধন করেছেন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী। ৪ ডিসেম্বর ২০১০ তারিখে। সে উপলক্ষেই কাকরকান্দি গিয়েছিলাম। গিয়ে জানতে পারলাম যে, ওখান থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে সোহাগপুর নামে একটি গ্রাম রয়েছে, যা বিধবা পল্লী হিসেবে পরিচিতি বহন করে চলেছে ১৯৭১ সন থেকে। নাম শুনে হৃদয় বিহ্বল হলো। তীর্থ দর্শন হবে মনে করে সেখানে হাজির হলাম। সাংবাদিক-প্রতিবেদকদের একটি দলও গিয়েছিলেন সংবাদ সংগ্রহের জন্য।

গিয়ে যা শুনলাম, তা রীতিমতো ভয়াবহ অবিশ্বাস্য। অবিশ্বাস্য হলেও ঘটেছে। বিশ্বাস হয়েছে। ১৯৭১ সাল। ২৫ জুলাই। কাকরকান্দি অঞ্চলের কয়েকজন মুসলিম লীগ নেতা পাকসেনাদের আমন্ত্রণ করে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিলেন এই সোহাগপুর গ্রামে। সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত। কৃষকেরা কেউ ক্ষেত নিড়ানি দিচ্ছেন। কেউ পরিচর্যা করছেন। কেউ বা শাকসবজি তুলছেন। কেউ মেঠো পথ বেয়ে বা আল ধরে হেঁটে যাচ্ছেন। এমনি সময় বর্বর পাকসেনাদের আক্রমণ। পাখি শিকারের মতো। মানুষ দেখলেই গুলি। বিশেষ করে পুরুষ মানুষ। যে যেখানে যেভাবে ছিল, তাকে সেখানে সেভাবেই গুলি করে হত্যা করা হলো। ধান নিড়াতে থাকলে, ধান ক্ষেতেই মৃতদেহ লুটিয়ে পড়লো। নামাজ পড়তে থাকলে, নামাজরত অবস্থায় শহীদ। বিশ্রাম নিতে থাকলে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে চিরবিশ্রাম। হাঁটতে থাকলে পথিমধ্যেই অনন্তশয়ন। ঘরের মধ্যে উঁকি মারছে মুসলিম লীগের লোকেরা অর্থাৎ রাজাকাররা। পুরুষ মানুষ দেখলেই হাতের ইশারা। পাকসেনা এসে ঘরের মধ্যে গুলি। একটি চিৎকার। রক্তের প্রস্রবন। তারপর সব শেষ। এমনি করে সোহাগপুর গ্রামে সকল গৃহকর্তাকে হত্যা করা হলো। বেঁচে রইল নারী ও শিশুরা। সেই সাথে দু’চারজন বৃদ্ধ, যাদের রাজাকাররা অক্ষম ভেবে ক্ষমা করে দিয়েছিল। সোহাগপুর গ্রামে সোহাগিনীদের বাঁচিয়ে রাখা হলো। তাদের সোহাগ করার মতো কেউ বেঁচে রইলো না। তাই বুঝি সোহাগপুর নামটিই অচল হয়ে পড়লো। বেঁচে থাকা সবাই বিধবা। সোহাগপুর গ্রামের সবাই বিধবা। স্বামীহারা। সোহাগবঞ্চিত। গ্রামটিকে তখন থেকে সবাই বিধবা পল্লী নামে চেনে। বিধবা পল্লী নামেই ডাকে।

গ্রামটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে। অজ পাড়াগাঁ। রাস্তাঘাট ছিল না। মাটির রাস্তা। পাকসেনাদের আগমনের খবর পেলে রাস্তা কেটে রাখা হতো। সেনা চলাচল হতো দুঃসাধ্য। কিন্তু গাঁয়ের কেউ জানতে পারেনি। কাকপক্ষীও না। চার-পাঁচজন রাজাকারের কীর্তি। তারাই সাধের পাকিস্তান রক্ষা করার জন্য পাকসেনা ডেকে এনেছে। তাদেরই পরিকল্পনা মতো পুরুষ নিধন করা হয়েছে। গ্রামটিকে পুরুষশূন্য করা হয়েছে। হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে তারা পাকসেনাদের আপনজন বলেছে। পাকদরদী সেজেছে। লুটতরাজও করেছে। মালে গনিমত তো তাদেরই হক।

পাকসেনাদের বর্বরতার চিহ্ন সারা বাংলাদেশেই বিদ্যমান। সকল অঞ্চলে দৃশ্যমান। কিন্তু সোহাগপুরকে সম্পূর্ণভাবে পুরুষশূন্য কেন করা হলো? বিধবাদেরকেই বা বঁচিয়ে রাখা হলো কেন? হুজুগের বশে এমনটা ঘটে না। পুরো ব্যাপারটাই পূর্বপরিকল্পিত। কি সেই পরিকল্পনা? এ নিয়ে গবেষণা হতে পারে।

স্থানীয় এবং আশপাশের গ্রাম শহরের লোকজনের সাথে আলাপ করেছি। পাকসেনাদের মনে কি ছিল, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। দুরাচার রাজাকারগুলিই হয়তো বলতে পারতো। কিন্তু কে তাদের সাক্ষ্য নেবে? গ্রামবাসীর সাথে তাদের দৃষ্টি বিনিময় ছিল বন্ধ। দুরাচারেরাও এড়িয়ে চলতো। তারপর মোশতাক-জিয়ার আশীর্বাদে তারাই আবার প্রতিষ্ঠা পেল। জনমনে নয়। ক্ষমতায়। ফলে গবেষণা-সমীক্ষা আর হলো না। চাপা পড়ে গেল সব। গণকবরের খবরই গায়েব হয়ে গেল। সৃষ্টি হলো নতুন কাহিনী, দু’চারজন দুষ্কৃতকারী পালানোর সময় নিহত হয়েছে। গণহত্যা হয়নি। নতুন ইতিহাসে মাটিতে চাপা পড়ে রইলো একাত্তরের নৃশংসতা। রাজনীতিকরা এ নিয়ে মাঠ গরম করলেন না। গবেষকরা গবেষণা করলেন না। মুখর সাংবাদিকরাও নীরব রইলেন। রয়ে গেল বিধবা পল্লী। বেঁচে রইলেন যৌবনে বৈধব্য বরণকারী নারীরা। তাদের ভাষায় মরার মতো বেঁচে ছিলেন তারা। একানব্বই সনে নির্বাচনী সফরে এসে ঘটনাটি জানতে পারেন বেগম মতিয়া চৌধুরী। তিনি জানালেন যে, বিদেশে অবস্থানরত লেখিকা মিনা ফারাহ খবর পেয়ে সোহাগপুরে এসেছিলেন এবং তথ্য সংগ্রহ করে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। কবর ফুঁড়ে যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে জানান দিল তাদের দুর্ভাগ্য বার্তা। দীর্ঘদিনের নীরবতা ছেদ পড়লো। প্রথমে মৃদু গুঞ্জন। ধীরে ধীরে পুনঃপ্রকাশ পেল বর্বরতার ইতিহাস। বিধবাদের বোবা কান্নায় ভাষা ফিরে এলো। নিষ্ঠুর নীরবতা ভঙ্গ করে বিধবারাই ব্যক্ত করলেন তাদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণের কথা। মানবতা স্তম্ভিত হলো। দেশ-বিদেশ থেকে লোকজন ছুটে আসতে শুরু করলো। নিহতদের শ্রদ্ধা জানাতে। জীবিতদের দুঃখ ভাগ করে নিতে। 

সংশ্লিষ্ট বই

পাঠকের মতামত
রিভিউ লিখুন
রিভিউ অথবা রেটিং করার জন্য লগইন করুন!