logo
0
item(s)

বিষয় লিস্ট

রাজিয়া সুলতানা এর কথাশিল্পী নজরুল

কথাশিল্পী নজরুল
এক নজরে

মোট পাতা: 219

বিষয়: গবেষণা

উপন্যাস-চিন্তা

 

কথা বলা আর কথাকে শিল্প বানানোতে দুস্তর ব্যবধান। কথাশিল্পীর হাতে থাকে সেই শিল্পসৃষ্টির হাতিয়ার। জীবনের কাহিনীকে উপন্যাস-লেখক সন্ধান করেন, জীবনের নতুন নতুন খাদকে আবিষ্কার করেন এবং তাঁর নিজস্ব হাতিয়ার দিয়ে সেই খাদ কেটে স্বর্ণখনির উৎসমুখ উদ্ধার করে পাঠককে এক অপরিচিত আনন্দে উজ্জীবিত করেন। ‘কার্যকারণশৃঙ্খলিত, চরিত্রদ্যোতক ও জীবন-স্বরূপনির্দেশক কাহিনীই উপন্যাসের সংজ্ঞা।’ প্রতিটি উপন্যাসেই আমাদের প্রত্যাশা থাকে একটি সময়গত প্রেক্ষিত, বিশেষ একটি স্থান, ব্যক্তি-বিশেষ অথবা নির্বিশেষে মানব পরিমণ্ডলের যন্ত্রণা, আনন্দ, দ্বিধা ও সংকোচ এবং এমন একটি ভাষা যার জীবনের মূল্যবোধকে বহন করবার ক্ষমতা থাকে। ঔপন্যাসিকের প্রধান লক্ষ্য থাকে পাঠকের মনে প্রজ্ঞা, পরিমিতি ও রসবোধকে জাগ্রত করা। অবশ্যই পাঠকের হৃদয়ে প্রবেশ করবার চাবিকাঠি তাঁর হাতে থাকবে। গল্পের অধিষ্ঠান মানুষের মনোরাজ্যে আর উপন্যাসের আবেদন হৃদয়ের অসীমতায় অফুরান। যদি লেখকের চিন্তাধারায় অপরিমিত প্রজ্ঞা আর বিশ্লেষণের সমৃদ্ধি না থাকে তাহলে কথাশিল্পের অধিরাজ্যে লেখকের প্রবেশাধিকার কই?

বিশ্বসাহিত্যে উপন্যাস যখন বেশ গড়ে উঠেছে তখন বাংলা উপন্যাসের কোন লক্ষণই নেই। ব্রিটিশ অধিকারেরও প্রায় একশো বছর পরে বাংলাদেশের বিত্তবান সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে উপন্যাসের জন্ম হয়।

১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ফারসির পরিবর্তে ইংরেজী রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে। তারপর থেকে ঔপন্যাসিক ও পাঠক এদেশে মোটামুটিভাবে তৈরি হতে থাকে। সমাজ তখন সামন্ততান্ত্রিক এবং রাজনীতিগত এক জটিল পরিবর্তনের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থারও পরিবর্তন ঘটছে। চাকুরিজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণী সবে সৃষ্টি হচ্ছে। মধ্যবিত্ত, মেহ্নতী ও সাধারণ মানুষের শ্রেণী তখন থেকে গড়ে উঠছে। এই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর আগ্রহই আধুনিক উপন্যাসের জন্মকে সম্ভব করে তোলে। তারা অবসর সময়ে উপন্যাস পাঠের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলো। অন্যদিকে, উপন্যাস বিনে-পয়সায় পড়া যায়, কিন্তু নাটক বা থিয়েটার বিনে পয়সায় দেখা সম্ভব হয় না।

আমরা জানি— উপন্যাস সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় সাহিত্য-আঙ্গিক; এর কারণ কি? সমালোচকরা বলেন— গত যুগের বা অতীতের গল্পপিপাসা ও মহাকাব্যের আস্বাদন-ইচ্ছা দখল করেছে এ যুগের কথাসাহিত্য। তাই বলা চলে— রূপকথা, উপকথা, মহাকাব্য, নীতিগল্প ও নাটকীয় দ্বন্দ্বের সম্মিলিত অবয়ব উপন্যাস। অর্থাৎ সব আঙ্গিকের মিশ্রিত উপাদানে উপন্যাসের রস প্রস্তুত হয়।

বর্তমান যুগের সর্বাপেক্ষা বর্ধিষ্ণু সাহিত্য-শিল্প বলেই এর পতনের সম্ভাবনাও অনেক বেশী। উপন্যাস-সাহিত্যের অতরুণ লেখক প্রেমেন্দ্র মিত্র একদা এ সম্পর্কে এক সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলেন :

উপন্যাস নাকি মুমূর্ষু। ঠিক শ্বাস না উঠলেও তার শেষ দশার অনেক লক্ষণই নাকি স্পষ্ট প্রকাশ পাচ্ছে বলে সাহিত্য জগতে একটা আশঙ্কা জেগেছে কিছুকাল। সারা দুনিয়াতো বটেই, আমাদের দেশেও সাময়িক পত্রিকার বিজ্ঞাপনের সাক্ষ্য তা অন্তত বলে না। পাঠাগারে তাকের পর তাক বেড়েই চলেছে। ছাপাখানারা ছেপে কূল পাচ্ছে না। উপন্যাসে সাহিত্যের বাজার ছেয়ে ফেলছে বর্ষার প্রশ্রয়ে নব-তৃণাঙ্কুরের মত কি?... আর সংখ্যাধিক্যেও যা দেখা যায় তা-ও নাকি সঠিক নয়। উপন্যাস অনেক বেরুচ্ছে, কিন্তু দু’একটি বাদে তার অধিকাংশেরই পরমায়ু অত্যন্ত ক্ষীণ, প্রসারও সঙ্কীর্ণ।

 

একালের উপন্যাস সম্পর্কে তা সর্বাংশে সত্য না হলেও এর মধ্যে কিছু সত্য বোধ হয় আছে। নাভিশ্বাস উঠেছে বলে আমরা পাঠকরা যেমন এর আশা ছাড়তে পারি না, তেমনি পারেন না আমাদের লেখকরা। সংখ্যার বিপুলত্বে এবং শনৈঃ শনৈঃ প্রকাশের বাহুল্যে ব্যাঙের ছাতার সঙ্গে এর তুলনা চলে না; চলে কেবল পর্যাপ্ত-ফলভারনম্র একটি বিশাল বৃক্ষের সঙ্গে। হয়তো বৃক্ষের কোনো কোনো ফলের পক্কতা পূর্ণ হয়নি; হয়তো কোনো ফলটি অকালপক্ক, কোনটি কীটদষ্ট, কোনটি অভ্যক্ষ্য। সংখ্যায় অজস্র বলেই আমরা তার মধ্য থেকে কিছু না কিছু স্বাদু বস্তু লাভ করে থাকি একথা নিঃসন্দেহে বলা চলে।

বলা বাহুল্য, বাংলা সাহিত্যে প্রথম জীবনরসকে উপন্যাসের পাত্রে পরিবেশন করেছিলেন যাঁরা, তাঁদের পথ সহজ ছিল না। প্যারীচাঁদের হাতে ছিল ভিত্ নির্মাণের দায়িত্ব। আর বঙ্কিমের হাতে সে দায়িত্ব প্রতিশ্রুতির মর্যাদায় অভিষিক্ত হলো। বঙ্কিমের পর যাঁরা এলেন তাঁদের পথ ছিল বিচিত্র বর্ণচ্ছটায় উজ্জ্বল। প্রত্যেক লেখকের মত রবীন্দ্রনাথ নিজেও একটি বিশেষ সম্মোহন উপন্যাসে আনতে চেয়েছিলেন। সম্মোহন বলতে এখানে ইতিহাস, সমাজ বা রাজনীতির আকর্ষণকে বোঝানো হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে রাজনীতি অল্পবিস্তর রয়েছে, ইতিহাসও এসেছে, কিন্তু অবিমিশ্র ঐতিহাসিকতা নিয়ে নয়। মনোবিশ্লেষণের গভীরতায় ও বিষয় সন্নিবেশের নৈপুণ্যে রবীন্দ্রনাথ বাংলা উপন্যাসে কত বিচিত্র পথের সন্ধান দিলেন। বাংলা উপন্যাসের গতিপথ গেল বদলে। রবীন্দ্রোত্তর যুগের লেখকরা একে একে এগিয়ে এলেন। মনোবিকলন, নরনারীর দেহচেতনা, সামাজিক জটিলতা, অর্থনৈতিক পীড়ন, ব্যক্তিজীবনে শূন্যতাবোধ- ইত্যাদি বহুবিধ জটিলতা উপন্যাসের পরিধিকে প্রসারিত করল।

উনিস শতকে দোভাষী পুঁথি সাহিত্যের আঙ্গিক বর্জন করে মুসলমানদের মধ্যে সাহিত্যচর্চার যে প্রাথমিক প্রয়াস দেখা দেয়— তা ছন্দোবদ্ধ পদ্য নয়, গদ্য। খোন্দকার শামসু্দ্দীন সিদ্দিকীর দ্বারা (’উচিৎ শ্রবণ’, ১৮৬০) এ শুভ-উদ্বোধন সম্ভব হয়েছিল। গোলাম হোসেনের ‘হাড় জ্বালানী’ (১৮৬৪) ও শেখ আজীমদ্দীনের ‘কড়ির মাথায় বুড়োর বিয়ে’ (১৮৬৮)-তে যে ভাষা ব্যবহার করা হয় তা গদ্যে-পদ্যে মিশ্রিত সহজ ও সাধু বাংলা। এতে আমরা সে-কালের জীবনধারণ-পদ্ধতি, কিছু সমাজ-লক্ষণ এবং সমাজ-সচেতনতার পরিচয় পাই। হয়তো উপন্যাসের কিছু বীজও এর মধ্যে উপ্ত ছিল। তারপর কথাশিল্পীর এক বিরাট সম্ভাবনা নিয়ে দেখা দিলেন মীর মশাররফ হোসেন। বলতে গেলে তাঁর হাতেই মুসলিম কথাসাহিত্যের যাত্রাশুরু।

সংশ্লিষ্ট বই

পাঠকের মতামত
রিভিউ লিখুন
রিভিউ অথবা রেটিং করার জন্য লগইন করুন!