logo
0
item(s)

বিষয় লিস্ট

ড. অনুপম কুমার পাল এর রবীন্দ্রসঙ্গীত: আমাদের অর্জন

রবীন্দ্রসঙ্গীত:  আমাদের অর্জন
এক নজরে

মোট পাতা: 216

বিষয়: গবেষণা

প্রথম পরিচ্ছেদ

 

অখণ্ড বাঙালিসত্তা ও রবীন্দ্রগান

উত্তর-ভারতীয় সঙ্গীত-ইতিহাসে বাংলা ভাষায় গান রচনা ও চর্চার সূত্রপাত প্রথম কার দ্বারা হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানা না-গেলেও হরিনারায়ণ গুপ্তের পুত্র রামনিধি গুপ্ত বা নিধুবাবু (১৭৪১-১৮৩৯ খ্রি.) পদ্ধতিগতভাবে ‘টপ্পা’ গীতরীতি প্রচলনের মাধ্যমে এক অভিনব ধারায় বাংলাগানকে সমৃদ্ধ ও সঙ্গীত-রসজ্ঞ মহলে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এ কথা ইতিহাস খ্যাত। এ ধারায় টপ্পাকার ও কবি কালিদাস চট্টোপাধ্যায় বা কালী মির্জা (১৭৫০-১৮২০ খ্রি.), বিষ্ণুপুর ধ্রুপদ-ঘরানার পথিকৃৎ রামশঙ্কর ভট্টাচার্য (১৭৬১-১৮৫৩ খ্রি.), এবং বাংলা ভাষার খেয়াল রচয়িতা ও রীতির প্রবর্তক হিসেবে রঘুনাথ রায় (১৭৫০-১৮৩৬ খ্রি.)-এর নাম বিশেষভাবে খ্যাত। এঁরা ছিলেন মূলত বাংলাভাষায় উচ্চাঙ্গসঙ্গীত চর্চার পুরোধা।

বাংলা গানের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাভাষায় লঘুসঙ্গীত চর্চার ক্ষেত্রকে চরম উৎকর্ষসাধনসহ স্বতন্ত্র-ধারা প্রতিষ্ঠায় পঞ্চ গীতিকবির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যথাক্রমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১ খ্রি.), দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩-১৯১৩ খ্রি.), রজনীকান্ত সেন (১৮৬৫-১৯১০ খ্রি.), অতুলপ্রসাদ সেন (১৮৭১-১৯৩৪ খ্রি.), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬ খ্রি.) প্রমুখ। বাংলা গানের যুগস্রষ্টা হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আজো অমলিন।

বাঙালি জাতি এবং বাংলা ভাষা রবীন্দ্রনাথের কাছে এক অপরিশোধ্য ঋণজালে আবদ্ধ। কবি পদ্মাতীরের মানুষের পরমাত্মীয়। আমাদের ভাষা সাহিত্য এবং স্বাধীনতার অন্তর্গত এক অসাধারণ প্রাণপুরুষ রবীন্দ্রনাথ নিত্যতায় উজ্জ্বল অবিনাশী। পৃথিবীর প্রধান এবং উল্লেখযোগ্য কবিদের একজন, যাঁর সব্যসাচী হাতের স্পর্শে প্রাণ পেয়েছে বাংলা ছোটগল্পের সীমাবদ্ধ অধ্যায়, উপন্যাস ও নাটকে এসেছে বৈচিত্র্য। আর সঙ্গীতে তিনি অতুলনীয় স্রষ্টা। রবীন্দ্রনাথের গানে একাধারে ভারতীয় রাগসঙ্গীতের সুরসম্পদ এবং খাঁটি দেশি সঙ্গীতের সুরমাধুর্য ও তার সহজ-সরল ছন্দ উপভোগ করা যায়।

রবীন্দ্রনাথের গান দেশি সঙ্গীতের আদর্শে রচিত হলেও মার্গীয় সঙ্গীত থেকে শক্তি সঞ্চয় করেছে বলা যায়।

“জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই আকস্মিকতার স্থান নেই। রসের ক্ষেত্র, অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র— সর্বত্রই একটা ধারাবাহিকতা আছে, কোথাও প্রকট কোথাও প্রচ্ছন্নভাবে।”১

‘সে যুগে আজকালকার মতো রবীন্দ্র আবহাওয়া ছিল না। ছিল না রবীন্দ্রচর্চার এত ব্যাপক ও বিপুল আয়োজন। ব্যক্তির রুচি-গঠনও তাই আবহাওয়ার আনুকূল্য পায়নি।

বিপুল জনসমাজে তাঁর গান যদিও-বা কেউ গাইতেন, তা-ও বিচ্ছিন্নভাবে, দুটি একটি গানের পুঁজি নিয়ে, ঘরোয়া আড্ডায় আর সুনির্দিষ্ট কিছু গান গাওয়া হত ব্রাহ্মসমাজে, সাধারণ বাঙালিকে তা স্পর্শ করত না। ব্রাহ্মসমাজের বাইরে যে অগণিত সাধারণকে নিয়ে তৎকালীন বঙ্গসমাজ, সেখানে সে গানের রসগ্রাহী শ্রোতা সেকালে খুব বেশি ছিলেন না। বস্তুত বাংলা কাব্যসঙ্গীতের যে ধারায় বৃহত্তর বাঙালি সমাজ মজে ছিল, সে ধারাই ছিল অন্যরকম। এ যুগের মতো রবীন্দ্রসৃষ্ট পরিশীলিত কাব্যরুচিকে সাহিত্য রসাস্বাদনের পূর্বশর্ত হিসেবে তখনকার শিক্ষিত সমাজ গ্রহণ করতে পারেনি। বিশ্বকবির অনুপম রুচিস্নিগ্ধ সুরবিহার তখন বাঙালির কানে পৌঁছালেও মরমে সবটা বোধ করি পৌঁছাতে পারেনি’।২ ফলত রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইয়েদের পরিসর সত্যিই খুব ছোট ছিল। আবার একটা বিশেষ মহল কবির গানকে স্টেটাস মেইনটেইনের জন্য নিজেদের ‘মনোপলি প্রপার্টির’৩ মতো কুক্ষিগত করে রাখতে চাইতেন।

সঙ্গীত গুরুমুখী বিদ্যা। বৈদিক যুগ শেষ হয়ে মুসলমান রাজত্বের অবসানের পর ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনব্যবস্থা চালু হলে সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতি বদলে গিয়ে ধনতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে। ফলে কলকাতা শহরে ধনী বিত্তশালী ব্যবসায়ী শ্রেণীর আহ্বানে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের গুণী শিল্পীরা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক ধনীসমাজ সঙ্গীতকে একটি সম্মানসূচক বিদ্যা বলে মনে করতেন। যার ফলে সঙ্গীতের চর্চা, প্রচার, প্রসারের পৃষ্ঠপোষকতা কেবল ধনী সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকল।

রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাবের আগে বাংলা গানের দুটি স্পষ্ট ধারা ছিল। একটি দেশাত্মবোধক বাংলাগান এবং আরেকটি বাংলা মঞ্চাশ্রয়ী নাটকের গান। আত্মোদ্ঘাটনের চেয়ে তাতে জনমনোরঞ্জনের প্রয়াস প্রধান ছিল।

নবাবি যুগের অবসান যে জীর্ণতা রেখে গেল সমাজে, যে জড়তা জীবনে সেইটুকু গুছাতে সারাবাংলা উনিশ শতকী নবজাগরণের অনেকটা খরচ হল, রবীন্দ্রনাথকেও কম লড়তে হয়নি।

কী জীবনে, কী সাহিত্যে তাঁর কর্মকাণ্ড অনেক ধীরগতিতে বিস্তার লাভ করেছিল অর্থাৎ বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তাঁর গানের ঘোরাঘুরি ছিল বিশিষ্টদের পরিমণ্ডলে, সাধারণ্যে নয়।

“ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে জনসমাজের রুচির পরিবর্তন এবং মূল্যবোধের যথেষ্ট বিবর্তন ঘটেছে। প্রধানত ঠাকুরবাড়ির সাঙ্গীতিক পরিবেশ এবং ব্রহ্মসঙ্গীতে রবীন্দ্রনাথের অবদানই সামাজিক ও সাহিত্যিক রুচি উন্নয়নে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছে। আগের দিনে সঙ্গীতের সংগে বাগানবাড়ি, বাঈজি, বারবণিতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।”৪ এর বাইরে পূজাপার্বণের অনুষ্ঠানগুলো এক হিসেবে সঙ্গীতচর্চার পক্ষে অনুকূল ছিল।

“কী সাহিত্যে, কী জীবনে, কী গানে, তাঁর প্রভাব এতই আস্তে ছড়িয়েছিল যে, আজ শুনতে যদিও তাক লাগে, আমাদের ছেলেবেলাতেও, অর্থাৎ বিশশতকের তৃতীয় দশকের আরম্ভ পর্যন্ত, তাঁর গানের ঘোরাঘুরি ছিল বিশিষ্টদের ছোট্ট মহলেই।... ফলত বিশ শতকের প্রথম দুই দশক ধরেও গান বাংলাদেশে দুঃখেই থাকল। ততদিনে বৈষ্ণব কীর্তনে অরুচি ধরেছে, রামপ্রসাদীগানে মন লাগে না, যাত্রা গানে, লেটোগানেও বিষয়বৈচিত্র্য নেই। সাধারণের মধ্যে যে গান চলত সেটাও নির্জীব, স্থুল, কৌশল, কসরৎ, লক্ষ্যবিহীন স্রোতের ধারা। আর খেয়াল যেহেতু তখন কালোয়াতির যাঁতাকলে কৌশল প্রকাশের বস্তু হয়ে উঠল, তাই অনেক সজ্জন গীতজগতের আঙিনা থেকে মুখ ঘোরালেন। আশা ছিল শুধু রবীন্দ্রনাথের নান্দনিক গানে, ভাবের রসযমুনায়। গ্রামোফোন-রেকর্ডের পুরনো ওস্তাদি কামগন্ধী গানে তেষ্টা মেটানোর মায়া কাটিয়ে উঠলেন কেউ কেউ, যখন সাহানাদেবী আর কনক দাশের প্রথম কয়েকটি রেকর্ডে রবীন্দ্রসঙ্গীত নতুন করে কানে লাগালেন।”৫ এরপর চরম উৎকর্ষ অর্জন করে প্রযুক্তির বিকাশ ও চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে।

সংশ্লিষ্ট বই

পাঠকের মতামত
রিভিউ লিখুন
রিভিউ অথবা রেটিং করার জন্য লগইন করুন!