কার্ট

সব বই লেখক বিষয়

বিষয় লিস্ট

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর চাঁদের পাহাড়

চাঁদের পাহাড়
এক নজরে

মোট পাতা: 118

বিষয়: উপন্যাস

** বইটি ডাউনলোড করে পড়তে আপনার সেইবই অ্যাপটি ব্যবহার করুন।

প্রথম পরিচ্ছেদ

শঙ্কর একেবারে অজ পাড়াগাঁয়ের ছেলে। এইবার সে সবে এফ.এ. পাশ দিয়ে গ্রামে বসেচে। কাজের মধ্যে সকালে বন্ধুবান্ধবদের বাড়িতে গিয়ে আড্ডা দেওয়া, দুপুরে আহারান্তে লম্বা ঘুম, বিকেলে পালঘাটের বাঁওড়ে মাছ ধরতে যাওয়া। সারা বৈশাখ এইভাবে কাটবার পরে একদিন তার মা ডেকে বল্লেন — শোন একটা কথা বলি শঙ্কর। তোর বাবার শরীর ভালো নয়। এ অবস্থায় আর তোর পড়াশুনো হবে কী করে? কে খরচ দেবে? এইবার একটা কিছু কাজের চেষ্টা দ্যাখ।

মায়ের কথাটা শঙ্করকে ভাবিয়ে তুললে। সত্যিই তার বাবার শরীর আজ ক’মাস থেকে খুব খারাপ যাচ্চে। কলকাতার খরচ দেওয়া তাঁর পক্ষে ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠচে। অথচ করবেই বা কী শঙ্কর? এখন কি তাকে কেউ চাকুরী দেবে? চেনেই বা সে কাকে?

আমরা যে সময়ের কথা বলচি, ইউরোপের মহাযুদ্ধ বাধতে তখনও পাঁচ বছর দেরী। ১৯০৯ সালের কথা। তখন চাকুরীর বাজার এতটা খারাপ ছিল না। শঙ্করদের গ্রামের এক ভদ্রলোক শ্যামনগরে না নৈহাটিতে পাটের কলে চাকুরি করতেন। শঙ্করের মা তাঁর স্ত্রীকে ছেলের চাকুরীর কথা বলে এলেন, যাতে তিনি স্বামীকে বলে শঙ্করের জন্যে পাটের কলে একটা কাজ যোগাড় করে দিতে পারেন। ভদ্রলোক পরদিন বাড়ী বয়ে বলতে এলেন যে শঙ্করের চাকুরীর জন্যে তিনি চেষ্টা করবেন।

শঙ্কর সাধারণ ধরণের ছেলে নয়। স্কুলে পড়বার সময় সে বরাবর খেলাধুলোতে প্রথম হয়ে এসেছে। সেবার মহকুমার এক্‌জিবিশনের সময় হাইজাম্পে সে প্রথম স্থান অধিকার করে মেডেল পায়। ফুটবলে অমন সেন্টার ফরওয়ার্ড ও অঞ্চলে তখন কেউ ছিল না। সাঁতার দিতে তার জুড়ি খুঁজে মেলা ভার। গাছে উঠতে, ঘোড়ায় চড়তে, বক্সিং-এ সে অত্যন্ত নিপুণ। কলকাতায় পড়বার সময় ওয়াই.এম.সি.এ. তে সে রীতিমতো বক্সিং অভ্যাস করেচে। এই সব কারণে পরীক্ষায় সে তত ভালো করতে পারেনি, দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিল।

কিন্তু তার একটি বিষয়ে অদ্ভূত জ্ঞান ছিল। তার বাতিক ছিল যত রাজ্যের ম্যাপ ঘাঁটা ও বড় বড় ভূগোলের বই পড়া। ভূগোলের অঙ্ক কষতে সে খুব মজবুত। আমাদের দেশের আকাশে যে সব নক্ষত্রমণ্ডলী ওঠে, তা সে প্রায় সবই চেনে— ওটা কালপুরুষ, ওটা সপ্তর্ষি, ওটা ক্যাসিওপিয়া, ওটা বৃশ্চিক। কোন মাসে কোনটা ওঠে, কোন দিকে ওঠে— সব ওর নখ- দর্পণে। আকাশের দিকে চেয়ে তখনি বলে দেবে। আমাদের দেশের বেশী ছেলে যে এসব জানে না, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে।

এবার পরীক্ষা দিয়ে কলকাতা থেকে আসবার সময় সে একরাশ ওই সব বই কিনে এনেচে, নির্জ্জনে বসে প্রায়ই পড়ে আর কী ভাবে ওই জানে। তারপর এল তার বাবার অসুখ, সংসারের দারিদ্র্য এবং সঙ্গে সঙ্গে মায়ের মুখে পাটকলে চাকুরী নেওয়ার জন্যে অনুরোধ। কী করবে সে? সে নিতান্ত নিরুপায়। মা-বাপের মলিন মুখ সে দেখতে পারবে না। অগত্যা তাকে পাটের কলেই চাকুরী নিতে হবে। কিন্তু জীবনের স্বপ্ন তাহলে ভেঙ্গে যাবে, তাও সে যে না বোঝে এমন নয়। ফুটবলের নাম করা সেন্টার ফরওয়ার্ড, জেলার হাই জাম্প চ্যাম্পিয়ান, নামজাদা সাঁতারু শঙ্কর হবে কিনা শেষে পাটের কলের বাবু? নিকেলের বইয়ের আকারের কৌটোতে খাবার কি পান নিয়ে ঝাড়ন পকেটে ক'রে তাকে সকালের ভোঁ বাজতেই ছুটতে হবে কলে - আবার বারোটার সময় এসে দুটো খেয়ে নিয়েই আবার রওনা— ওদিকে সেই ছ’টার ভোঁ বাজলে ছুটি। তার তরুণ তাজা মন এর কথা ভাবতেই পারে না যে। ভাবতে গেলেই তার সারা দেহ-মন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে— রেসের ঘোড়া শেষকালে ছ্যাকরা গাড়ি টানতে যাবে? সন্ধ্যার বেশি দেরি নেই। নদীর ধারে নির্জনে বসে-বসে শঙ্কর এইসব কথাই ভাবছিল। তার মন উড়ে যেতে চায় পৃথিবীর দূর, দূর দেশে— শত দুঃসাহসিক কাজের মাঝখানে। লিভিংস্টোন, ষ্ট্যানলির মতো, হ্যারি জনষ্টন, মার্কো পোলো, রবিনসন ক্রুসোর মতো। এর জন্যে ছেলেবেলা থেকে সে নিজেকে তৈরি করেচে — যদিও এ কথা ভেবে দেখেনি অন্য দেশের ছেলেদের পক্ষে যা ঘটতে পারে, বাঙালী ছেলেদের পক্ষে তা ঘটা এক রকম অসম্ভব। তারা তৈরি হয়েছে কেরানি, স্কুলমাস্টার, ডাক্তার বা উকিল হবার জন্যে। অজ্ঞাত অঞ্চলের অজ্ঞাত পথে পাড়ি দেওয়ার আশা তাদের পক্ষে নিতান্তই দুরাশা।

প্রদীপের মৃদু আলোয় সেদিন রাত্রে সে ওয়েস্টমার্কের বড় ভূগোলের বইখানা খুলে পড়তে বসল। এই বইখানার একটা জায়গা তাকে বড় মুগ্ধ করে। সেটা হচ্ছে প্রসিদ্ধ জার্মান পর্যটক অ্যাণ্টন হাউপ্টমান লিখিত আফ্রিকার একটা বড় পর্ব্বত — মাউনটেন অফ দি মুন (চাঁদের পাহাড়) আরোহণের অদ্ভুত বিবরণ। কতবার সে এটা পড়েচে। পড়বার সময় কতবার ভেবেচে হের হাউপ্টমানের মতো সেও একদিন যাবে মাউনটেন অফ দি মুন জয় করতে। স্বপ্ন! সত্যিকার চাঁদের পাহাড় দূরের জিনিসই চিরকাল।.......... চাঁদের পাহাড় বুঝি পৃথিবীতে নামে?

সে রাত্রে বড় অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখল সে…

চারধারে ঘন বাঁশের জঙ্গল। বুনো হাতির দল মড় মড় করে বাঁশ ভাঙচে। সে আর একজন কে তার সঙ্গে, দু’জনে একটা প্রকাণ্ড পাহাড়ে উঠচে, চারধারের দৃশ্য ঠিক হাউপ্টমানের লেখা মাউনটেন অফ দি মুনের দৃশ্যের মতো। সেই ঘন বাঁশ বন, সেই পরগাছা ঝোলানো বড় বড় গাছ, নিচে পচাপাতার রাশ, মাঝে মাঝে পাহাড়ের খালি গা, আর দূরে গাছপালার ফাঁকে জ্যোৎস্নায় ধোয়া সাদা ধবধবে চিরতূষারে ঢাকা পর্বতশিখরটি — এক একবার দেখা যাচ্ছে, এক একবার বনের আড়ালে চাপা পড়চে। পরিষ্কার আকাশে দু-একটি তারা এখানে ওখানে। একবার সত্যিই সে যেন বুনো হাতির গর্জ্জন শুনতে পেলে। সমস্ত বনটা কেঁপে উঠল… এত বাস্তব বলে মনে হল সেটা, যেন সেই ডাকেই তার ঘুম ভেঙে গেল! বিছানার উপর উঠে বসল, ভোর হয়ে গিয়েচে, জানালার ফাঁক দিয়ে দিনের আলো ঘরের মধ্যে এসেচে।

উঃ, কি স্বপ্নটাই দেখেচে সে! ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়, বলে তো অনেকে।

অনেকদিন আগের একটি ভাঙা পুরোনো মন্দির আছে তাদের গাঁয়ে। বারভূঁইয়ার এক ভূঁইয়ার জামাই মদন রায় নাকি প্রাচীন দিনে এই মন্দির তৈরী করেন। এখন মদন রায়ের বংশে কেউ নেই। মন্দির ভেঙেচুরে গিয়েচে, অশ্বত্থ গাছ, বটগাছ গজিয়েচে কার্ণিসে — কিন্তু যেখানে ঠাকুরের বেদী তার উপরের খিলেনটা এখনো ঠিক আছে। কোনো মূর্ত্তি নেই, তবুও শনি-মঙ্গলবারে পূজো হয়, মেয়েরা বেদীতে সিঁদুর-চন্দন মাখিয়ে রেখে যায়। সবাই বলে ঠাকুর বড় জাগ্রত, --যে যা মানত করে তাই হয়। শঙ্কর সেদিন স্নান করে উঠে মন্দিরের একটা বটের ঝুরির গায়ে একটা ঢিল ঝুলিয়ে কি প্রার্থনা জানিয়ে এলে।

বিকেলে সে গিয়ে অনেকক্ষণ মন্দিরের সামনে দূর্ব্বাঘাসের বনে বসে রইল। জায়গাটা পাড়ার মধ্যে হোলেও বনে ঘেরা, কাছেই একটা পোড়ো বাড়ি; এদের বাড়ীতে একটা খুন হয়ে গিয়েছিল শঙ্করের শিশুকালে — সেই থেকে বাড়ীর মালিক এ গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র বাস করচেন; সবাই বলে জায়গাটায় ভূতের ভয়। একা কেউ এদিকে আসে না। শঙ্করের কিন্তু এই নির্জ্জন মন্দির প্রাঙ্গণের নিরালা বনে চুপ করে বসে থাকতে বড় ভালো লাগে।

ওর মনে আজ ভোরের স্বপ্নটা দাগ কেটে বসে গিয়েচে। এই বনের মধ্যে বসে শঙ্করের আবার সেই ছবিটা মনে পড়ল — সেই মড় মড় করে বাঁশঝাড় ভাঙছে বুনো হাতির দল, পাহাড়ের অধিত্যকার নিবিড় বনে পাতা-লতার ফাঁকে ফাঁকে অনেক উঁচুতে পর্বতের জ্যোৎস্নাপাণ্ডুর তুষারাবৃত শিখরদেশটা যেন কোন স্বপ্নরাজ্যের সীমা নির্দ্দেশ করচে। কত স্বপ্ন তো সে দেখেচে জীবনে — অত সুস্পষ্ট ছবি স্বপ্নে সে দেখেনি কখনো — এমন গভীর রেখাপাত করেনি কোনো স্বপ্ন তার মনে। ..........

সব মিথ্যে! তাকে যেতে হবে পাটের কলে চাকরি করতে। তাই তার ললাট-লিপি, নয় কি?

সংশ্লিষ্ট বই

পাঠকের মতামত
  • Rating Star

    “ ” - Robi User

  • Rating Star

    “শঙ্কর নামের এক ভারতীয় তরুনের আফ্রিকার ভয়ঙ্কর অরণ্য অভিযানের গল্প। গহীন অরণ্যে প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে মাসের পর মাস টিকে থেকে আবিষ্কার করে হিরের খনি। কিন্তু সে বুঝতেই পারে না যে, সে হিরের খনি আবিষ্কার করেছে। কুখ্যাত কালাহারি মরুভূমিতে এক লাশের সাথে প্রাপ্ত এক চিঠি পড়ে এবং নিজের সাথে হারিয়ে যাওয়া গুহার মধ্য থেকে আনা স্মারক পাথর মিলিয়ে নিশ্চিত হয় তার আবিষ্কার সম্বন্ধে। এ লড়াইয়ে সে তার অভিযানের বিজ্ঞ সঙ্গীকে হারায়। এ অভিযানের পূর্ণ রোমাঞ্চ নিতে পড়তে হবে বইটি। থ্রিলারধর্মী এ উপন্যাসটি লেখকের একটি অনবদ্য রচনা। ” - ইয়াহিয়া

  • Rating Star

    “ ” - Shahin Alam

  • Rating Star

    “ ” - Shamima Afroz

রিভিউ লিখুন
রিভিউ অথবা রেটিং করার জন্য লগইন করুন!