কার্ট

সব বই লেখক বিষয়

বিষয় লিস্ট

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর পদ্মা নদীর মাঝি

এক নজরে

মোট পাতা: 188

বিষয়: উপন্যাস

** বইটি ডাউনলোড করে পড়তে আপনার সেইবই অ্যাপটি ব্যবহার করুন।

পদ্ম নদীর মাঝি

ফ্রয়েড থেকে মার্কসবাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনের একটা বড় পরিবর্তন। মার্কসীয় দর্শনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ব্যক্তি- মানুষের জৈব চাহিদা যত সর্বগ্রাসীই হোক না কেন, তা কোন সমাজকে কোনভাবে অস্বীকার করতে পারে না। তাই কুবের ও কপিলার নতুন সংসার হয়েছিল ময়না দ্বীপে। পদ্মার পটভূমিতে কুবের-কপিলার ভালোবাসা উপন্যাসে কবিত্বময় সৌন্দর্য ছড়িয়েছে। স্ত্রী মালারও অনেক গুণ। তার ত্বকের মসৃণতা কুবেরকে আকৃষ্ট করে, ছেলেকে ভাত খাওয়াতে বসে সে চমৎকার রূপকথা বলে। পঙ্গু বলেই বাহিরের জগতের সঙ্গে তার পরিচয় কম -“জেলে পাড়ার রূঢ় বাস্তবতা তাই তাকে অনেকটা রেহাই দিয়েছে।” অকর্মণ্য পঙ্গু মালার সন্তানবাৎসল্য তাই জেলে পাড়ার ছোঁয়া বাঁচিয়ে ‍উচ্চবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারের কোন রমণীর ন্যায় নিখুঁত –“চারিদিকে অসভ্যতার আবেষ্টনী, অভিনয় সুমার্ত সভ্যতা।” তবুও মালার শারীরিক পঙ্গুতার মধ্যেই নিহিত ছিল কুবের-কপিলার অবৈধ ভালোবাসার বীজ। এ সমাজ-সংসারে লেখক তাদেরকে জায়গা দিতে পারেননি। কমিউনিজম শূধু রাজনৈতিক জীবনেই নয় শিকড় গেড়েছিল তাঁর পারিবারিক জীবনে, সমাজ জীবনে, রক্তে, মাংসে, চিন্তায়, চেতনায়, মেধা ও মননে। দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ করে পর্যুদস্ত হয়েও তিনি ‘পদ্মানদীর মাঝি’তে হোসেন মিয়ার চোখে স্বপ্ন দেখেছেন নতুন পৃথিবীর, নতুন মানুষের। যেখানে ধনী দরিদ্রের কোন প্রভেদ নেই, শাসক-শোষণ নেই, মৌলবি পুরুত নেই। সকলে মিলে সেখানে একটি ধর্মপালন করবে- সেটা হচ্ছে মানবধর্ম। লেখক তাঁর স্বপ্নকে সফল করতে গিয়ে হোসেন মিয়ার অবৈধ কারবারকে পর্যন্ত প্রশ্রয় দিয়েছেন। তার অবৈধ কাজগুলোকে পাঠকের কাছ থেকে সযত্নে আড়াল করার চেষ্টা পর্যন্ত করেছেন।

পদ্মার মতো রহস্যময়ী কপিলা কখনো অবাধ্য বাঁশের কঞ্চির মতো নুয়ে পড়েছে কুবেরের দিকে। আবার কখনো সোজা হয়ে সরে শ্যামা দাসের কাছে, আর দশটা সাধারণ রমণীর মতো গৃহস্থালির কাজ করেছে। পদ্মার গভীরতার মতোই তার মতের তল খুঁজে পাওয়া কুবেরের মতো পাকা মাঝিরও অসাধ্য হয়ে পড়ে। মালা ও কপিলা ছাড়াও অপ্রধান চরিত্রের মধ্যে যুগীও ও উপন্যাসে নক্ষত্রের ন্যায় দ্যুতি ছড়িয়েছে।শীল বাবুর রক্ষিতা যুগীর হৃদয়ের ভিতের যে দিগন্ত বিস্তৃত প্রান্তরের সন্ধান পাওয়া যায় তাতে উপন্যাসের স্বল্প পরিসর পেলেও পাঠকের হৃদয়ে বৃহৎ আসন দখল করে নেয়।

পদ্মানদীর মাঝি পদ্মার তীরবর্তী জেলেদের জীবনচিত্র। এসব অবহেলিত, বঞ্চিত, শোষিত মানুষগুলোর জীবনবৈচিত্র্য সরলতায়, জটিলতায়, কুটিলতায়, পঙ্কিলতায় পদ্মার মতোই রহস্যময় হয়ে একই সমান্তরালে বয়ে গেছে, বিশ্বসাহিত্যের দরবারে যা অবিস্মরণীয় উৎকর্ষে উজ্জ্বল।

বর্ষার মাঝামাঝি।

     পদ্মায় ইলিশ মাছ ধরার মরসুম চলিয়াছে। দিবারাত্রি কোন সময়েই মাছ ধরিবার কামাই নাই।সন্ধ্যার সময় জাহাজঘাটে দাঁড়াইলে দেখা যায় নদীর বুকে শত শত আলো অনির্বাণ জোনাকির মত ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। জেলে-নৌকার আলো ওগুলি। সমস্তরাত্রি আলোগুলি এমনিভাবে নদীবক্ষের রহস্যময় স্লান অন্ধকারে দুর্বোধ্য সঙ্কেতের মত সঞ্চালিত হয়। এক সময় মাঝরাত্রি পার হইয়া যায়। শহরে, গ্রামে, রেল-স্টেশনে ও জাহাজঘাটে শান্ত মানুষ চোখ বুঝিয়া ঘুমাইয়া পড়ে। শেষরাত্রে ভাঙা-ভাঙা মেঘে ঢাকা আকাশে ক্ষীণ চাঁদটি উঠে। জেলে-নৌকার আলোগুলি তখনো নেভে না। নৌকার খোল ভরিয়া জমিতে থাকে মৃত সাদা ইলিশ মাছ। লণ্ঠনের আলোর মাছের আঁশ চকচক করে, মাছের নিষ্পলক চোখগুলিকে স্বচ্ছ নীলাভ মণির মত দেখায়।

     কুবের মাঝি আজ মাছ ধরিতেছিল দেবীগঞ্চের মাইল দেড়েক উজানে। নৌকায় আরও দুজন লোক আছে, ধনঞ্জয় এবং গণেশ। তিনজনের বাড়িই কেতুপুর গ্রামে। আরও দু-মাইল উজানে পদ্মার ধারেই কেতুপুর গ্রাম।

     নৌকাটি বেশী বড় নয়। পিছনের দিকে সামান্য একটু ছাউনি আছে। বর্ষা-বাদলে দু-তিনজনে কোনরকমে মাথা গুঁজিয়া থাকিতে পারে। বাকি সবটাই খোলা। মাঝখানে নৌকার পাটাতনে হাত দুই ফাঁক রাখা হইয়াছে। এই ফাঁক দিয়া নৌকার খোলের মধ্যে মাছ ধরিয়া জমা করা হয়। জাল ফেলিবার ব্যবস্থা পাশের দিকে। ত্রিকোণ বাঁশের ফ্রেমে বিপুল পাখার মত জালটি নৌকার পাশে লাগানো আছে। জালের শেষসীমার বাঁশটি নৌকার পার্শ্বদেশের সঙ্গে সমান্তরাল। তার দুই প্রাপ্ত হইতে লম্বা দুটি বাঁশ নৌকার ধারে আসিয়া মিশিয়া পরস্পরকে অতিক্রম করিয়া নৌকার ভিতরে হাত দুই আগাইয়া আসিয়াছে। জালের এ দুটি হাতল। এই হাতল ধরিয়া জাল উঠানো এবং নামানো হয়।

     গভীর জলে বিরাট ঠোঁটর মত দুটি বাঁশে-বাঁধা জাল লাগে। দড়ি ধরিয়া বাঁশের ঠোঁট হাঁ-করা জাল নামাইয়া দেওয়া হয়। মাছ পড়িলে খবর আসে জেলের হাতের দড়ি বাহিয়া, দড়ির দ্বারাই জলের নীচে জালের মুখ বন্ধ করা হয়।

এ নৌকাটি ধনঞ্জয়ের সম্পত্তি। জালটাও তারই। প্রতি রাত্রে যত মাছ ধরা হয় তার অর্ধেক ভাগ ধনঞ্জয়ের, বাকি অর্ধেক কুবের ও গনেশের। নৌকা এবং জালের মালিক বলিয়া ধনঞ্জয় পরিশ্রমও করে কম। আগাগোড়া সে শুধু নৌকার হাল ধরিয়া বসিয়া থাকে। কুবের গনেশ হাতল ধরিয়া জালটা জলে নামায় এবং তোলে, মাছগুলি সঞ্চয় করে পদ্মার ঢেউয়ে নৌকা টলমল করিতে থাকে, আলোটা মিটমিট করিয়া জ্বলে, জোর বাতাসেও নৌকার চিরস্থায়ী গাঢ় আঁশটে গন্ধ উড়াইয়া লইয়া যাইতে পারে না। একহাতে একখানি কাপড়কে নেংটির মত কোমরে জড়াইয়া ক্রমাগত জলে ভিজিয়া, শীতল জলোবাসাতে শীত বোধ করিয়া, বিনিদ্র আরক্ত চোখে লণ্ঠনের মৃদু আলোয় নদীর অশান্ত জলরাশির দিকে চাহিয়া থাকিয়া কুবের ও গণেশ সমস্ত রাত মাছ ধরে। নৌকা স্রোতে ভাসিয়া যায়। বৈঠা ধরিয়া নৌকাকে তারা ঠেলিয়া লইয়া আসে সেইখানে যেখানে একবার একেবারে ঝাঁকের মধ্যে জাল ফেলিয়া বেশী মাছ উঠিয়াছিল। আজ খুব মাছ উঠিতেছিল। কিন্তু ভোরে দেবীগঞ্জে মাছের দর না জানা অবধি এটা সৌভাগ্য কিনা বলা যায় না। সকলেরই যদি এ রকম মাছ পড়ে দর কাল এত নামিয়া যাইবে যে বিশেষ কোন লাভের আশা থাকিবে না। তবে মাছের বড় ঝাঁক একই সময়ে সমস্ত নদীটা জুড়িয়া থাকে না, এই যা ভরসার কথা। বেশী মাছ সকলের নাও উঠিতে পারে।

সংশ্লিষ্ট বই

পাঠকের মতামত
  • Rating Star

    “ ” - Arafat Jewel

  • Rating Star

    “ ” - Masud Rana

  • Rating Star

    “ ” - Monirul Islam Anik

  • Rating Star

    “ ” - Nadu

রিভিউ লিখুন
রিভিউ অথবা রেটিং করার জন্য লগইন করুন!