কার্ট

সব বই লেখক বিষয়

বিষয় লিস্ট

মুহাম্মদ মুহিউদ্দীন এর ঈমানদীপ্ত দাস্তান দ্বিতীয় খণ্ড

এক নজরে

মোট পাতা: 333

বিষয়: উপন্যাস

** বইটি ডাউনলোড করে পড়তে আপনার সেইবই অ্যাপটি ব্যবহার করুন।

গম্ভীর মুখে কক্ষে পায়চারি করছেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবি। হাঁটতে-হাঁটতে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন- ‘দেশের সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হতে পারে এবং তারা ঐক্যবদ্ধ আছেও। বিচ্ছিন্নতার পথ অবলম্বন করছে জাতির কর্ণধারগণ। তুমি আমির-উজির-শাসক নামের বড়-বড় নেতাদের দেখে থাকবে আলী। মিসরবাসীর মুখে তো আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে বড়রা। আমার সঙ্গে বড়দের এই শত্রুতা ব্যক্তিগত নয়। আমি তাদের স্বপ্নের মসনদ দখল করে আছি এটাই তাদের অন্তর্জ্বালার কারণ।’
আলী বিন সুফিয়ান ও বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ নিবিষ্ট মনে শুনছেন সুলতানের বেদনামাখা কথাগুলো।
সময়টা ছিল ১১৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের এক বিকাল। জুন-জুলাইয়ে বিদ্রোহ দমন করে সুলতান আইউবি সঙ্গে-সঙ্গে আল-আজেদকে খেলাফতের মসনদ থেকে অপসারণ করেছিলেন। তার আগে তিনি কৌশলে সুদানিদের বিদ্রোহ দমন করে সেনাবাহিনী থেকে সুদানি বাহিনীকে বিলুপ্ত করেছিলেন। কিন্তু কোনো বিদ্রোহী নেতা, কমান্ডার কিংবা সৈনিককে সাজা না দিয়ে তিনি কৌশলে কার্যসিদ্ধি করেছিলেন।
তার পর যখন তারা পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, তখন সুলতান আইউবি এই বেয়াড়া মস্তকগুলোকে চিরতরে গুড়িয়ে দিতে রণাঙ্গনে সুদানিদের লাশের স্তূপ তৈরি করলেন। পদন্ডপদবির তোয়াক্কা না করে তিনি গ্রেফতারকৃতদের কঠোর শাস্তি দিলেন। অধিকাংশকে জল্লাদের হাতে তুলে দিলেন। কতিপয়কে কারাগারে নিক্ষেপ করলেন আর অবশিষ্টদের দেশান্তর করে সুদান পাঠিয়ে দিলেন।
‘দুমাস হয়ে গেল আমি রাজ্যের কোনো খোঁজ নিতে পারছি না। এক-একজন অপরাধীকে ধরে আনা হচ্ছে আর বিচার করে আমি তাদের মৃত্যুদন্ড প্রদান করছি। দুঃখে আমার কলিজাটা মোচড় দিয়ে উঠছে আলী। মনে হচ্ছে, আমি গণহত্যা করছি। আমার হাতে যারা জীবন দিচ্ছে, তাদের অধিকাংশই যে মুসলমান! আমার বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসতে চায়।’ পরম আক্ষেপের সঙ্গে বললেন সুলতান আইউবি।
মুখ খুললেন বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ - ‘সম্মানিত আমির! একজন কাফের আর একজন মুসলমান একই অপরাধে লিপ্ত হলে শাস্তি মুসলমানেরই বেশি পাওয়া উচিত। কাফেরের না আছে বুদ্ধি-বিবেক, না আছে ধর্ম চরিত্র। কিন্তু আল্লাহর দীনের আলো পাওয়ার পরও একজন মুসলমান কাফেরের মতো অপরাধ করা গুরুতর নয় কি? আপনি মুসলমানদের শাস্তি দিচ্ছেন বলে মর্মাহত হবেন না মহামান্য সুলতান! ওরা বিশ্বাসঘাতক ও মুসলিম নামের কলঙ্ক। ইসলামি সাম্রাজ্যের বিষফোঁড়া ওরা। যারা ইসলামের নামন্ডচিহ্ন ধুলোয় মিশিয়ে দিতে কাফেরদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে, এ-জগতে মৃত্যুদন্ডই তাদের উপযুক্ত প্রাপ্য। পরকালে তাদের জন্য আছে জাহান্নাম।’
‘আমার ব্যথাটা হলো শাদ্দাদ,  মিসরে আমি শাসক হয়ে আসিনি। আমার যদি ক্ষমতার মোহ থাকত, তা হলে মিসরের বর্তমান পরিস্থিতি আমার সম্পূর্ণ অনুকূল। কিন্তু আমি জানি, ক্ষমতার লোভ মানুষকে অন্ধ করে তোলে। মসনদপ্রিয় মানুষ চাটুকার-চালবাজদের বেশি পছন্দ করে। কিছু-ই না দিয়ে মিথ্যা প্রলোভন আর মনভোলানো রঙিন ফানুস দেখিয়েই তারা মাতিয়ে রাখে জাতিকে। তারা শয়তানি চরিত্রের মানুষকে আমলা নিয়োগ করে। অধীনদের রাজপুত্রের মর্যাদা দিয়ে রাখে আর নিজে হয় শাহেনশাহ। ক্ষমতার মসনদ রক্ষা করা ব্যতীত আর কিছুই তারা বোঝে না।
‘তোমাদের প্রতি আমার অনুরোধ, তোমরা এই মসনদ আমার থেকে নিয়ে নাও। আমাকে শুধু এটুকু প্রতিশ্রুতি দাও, আমার পথে তোমরা কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না। আর কিছু চাই না আমি। যে-লক্ষ্য নিয়ে আমি ঘর থেকে বের হয়েছি, আমাকে সেই উদ্দেশ্য পূরণ করতে দাও। হাজারো জীবন কুরবান করে এবং আরব মুজাহিদদের রক্তে নীলনদের পানির রং পরিবর্তন করে নুরুদ্দীন জঙ্গি মিসর ও সিরিয়াকে একীভূত করেছেন। এই ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্যকে আরও সম্প্রসারিত করতে হবে। সুদানকে মিসরের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ফিলিস্তিনকে ক্রুসেডারদের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে। ইউরোপের ঠিক মধ্যাঞ্চলের কোথাও নিয়ে খ্রিস্টানদের কোণঠাসা করে রাখতে হবে।
এসব বিজয় আমাকে অর্জন করতে হবে আমার শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নয় - আল্লাহর রাজ্যে তাঁরই শাসন প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু মিসর যে আমাকে পাঁকে জড়িয়ে রেখেছে! আমাকে তোমরা মিসরের এমন একটি ভূখন্ড দেখাও, যেটি ষড়যন্ত্র, বিদ্রোহ ও গাদ্দারি থেকে মুক্ত আছে!’ আপ্লুত কণ্ঠে বললেন আইউবি।
‘এসব ষড়যন্ত্রের মূল হোতা খ্রিস্টানরা। তারা কত জঘন্যভাবে আপন মেয়েদের বেহায়াপনার প্রশিক্ষণ দিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে, ভাবলে আমার মাথাটা হেঁট হয়ে আসে। ওরা ওদের মনোহারী রূপ আর জাদুকরী চাটুবাক্য দ্বারা আমাদের শাসকদের ঘায়েল করছে।’ বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
‘ভাষার আঘাত তরবারির আঘাতের চেয়েও মারাত্মক আলী। আমাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে-দেওয়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত খ্রিস্টান গুপ্তচর মেয়েরা তোমার দুর্বলতা বুঝে এমন ধারায়, এমন ক্ষেত্রে, এমন যথোপযুক্ত শব্দ ব্যবহার করবে যে, তুমি মোমের মতো গলে গিয়ে হাতের তরবারি কোষবদ্ধ করে দুশমনের পায়ে অর্পণ করবে। খ্রিস্টানদের অস্ত্র দুটি - একটি হলো ভাষা, অপরটি পশুবৃত্তি। মানবীয় চরিত্র ধ্বংস করে আমাদের মধ্যে এই পশুবৃত্তি ঢুকিয়ে দিতে ওরা সুন্দরী যুবতী মেয়েদের ব্যবহার করছে। এই অস্ত্র ব্যবহার করেই ওরা আমাদের মুসলিম আমির-শাসকদের হৃদয় থেকে ইসলামি চেতনাকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে।’ বললেন সালাহুদ্দীন আইউবি।
‘শুধু আমির-শাসকই নন সুলতান, মিসরের সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই অশ্লীলতার জীবাণু মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এ-অভিযানে খ্রিস্টানরা সফল। বিত্তবান মুসলিম পরিবারগুলোতেও এই বেহায়াপনার অনুপ্রবেশ ঘটেছে।’ বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
‘এটিই সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কথা। খ্রিস্টানদের সকল সৈন্য যদি একযোগে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তবু আমি তাদের মোকাবেলা করতে সক্ষম হব - করছিও। কিন্তু তাদের এই চারিত্রিক আগ্রাসনকে প্রতিহত করতে পারব কি-না আমার ভয় হয়। মুসলিম মিল্লাতের ভবিষ্যৎপানে তাকালে আমি শিউরে উঠি। তখন আমার কাছে মনে হয়, যদি সংস্কৃতিক আগ্রাসনের এই ধারা রোধ করা না যায়, তা হলে ভবিষ্যতে মুসলমান হবে নামমাত্র মুসলমান। তাদের মধ্যে ইসলামের নীতি-আদর্শ, সংস্কৃতি-চরিত্র কিছুই থাকবে না। খ্রিস্টান সভ্যতা-সংস্কৃতি লালন করে মুসলমানরা গর্ববোধ করবে। তাদের মধ্যে প্রকৃত ইসলাম বলতে কিছুই থাকবে না। মুসলমানদের দুর্বলতাগুলো আমার জানা আছে। মুসলমান শত্রু চেনে না। তারা শত্রুর পাতা আকর্ষণীয় ফাঁদে সরল মনে আটকে যায়। পাশাপাশি খ্রিস্টানদের দুর্বলতাগুলোও আমার অজানা নয়। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে একথা সত্য। কিন্তু ভেতরে তাদের মনের মিল নেই। ফরাসি-জার্মানি একে-অপরের দুশমন। ব্রিটিশ-ইতালীয়রা কেউ কাউকে পছন্দ করে না। মুসলমান তাদের সকলের শত্রু বলেই কেবল এই ইস্যুতে তারা একতাবদ্ধ হয়েছে। অন্যথায় তাদের পারস্পরিক বিরোধ শত্রুতার চেয়ে কম নয়। তাদের সম্রাট ফিলিপ অগাস্টাস একজন কুজাত মানুষ। অন্যরাও এর ব্যতিক্রম নয়। নারীর রূপ আর হিরা-মাণিক্যের চমক দেখিয়ে মুসলিম শাসকদের ওরা অন্ধ বানিয়ে রেখেছে। মুসলিম শাসকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাড়া দিলে ওরা পালাবার পথ পাবে না। ফাতেমি খেলাফতের অবসান ঘটিয়ে আমি শত্রুর সংখ্যা বৃদ্ধি করেছি। মসনদ পুনর্দখলের জন্য ফাতেমিরা সুদানি ও খ্রিস্টানদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধছে। আমার জন্য এ এক নতুন সমস্যা।’ বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবি।
‘ফাতেমিদের কবিকে কাল মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে।’ তথ্য দিলেন আলী বিন সুফিয়ান।
সালাহুদ্দীন আইউবি বললেন- ‘আম্মারাতুল ইয়ামানির কবিতা শুনে একসময় আমিও আপ্লুত হয়েছিলাম। কিন্তু খ্রিস্টানরা তার সেই ভাষা আর গীতিকে বিদ্রোহের আগুনে পরিণত করে ইসলামি চেতনাকে ভস্ম করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।’
আম্মারাতুল ইয়ামানি ছিল তৎকালের একজন নামকরা কবি। সে-যুগে এবং তার আগেও সাধারণ মানুষ কবিদের অনেক ভক্তি-শ্রদ্ধা করত। অগ্নিঝরা কবিতার মাধ্যমে তারা সৈন্যদের উজ্জীবিত করে তুলত, জনতাকে শত্রুর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলত। আম্মারাতুল ইয়ামানিও সেই মানের একজন কবি। একসময় সে কবিতার মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে জিহাদি চেতনা জাগিয়ে তুলেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে হতভাগাকে লোভে পেয়ে বসে। ফাতেমি খেলাফতের পৃষ্ঠপোষকতায় সুলতান যায় যে, লোকটি কেবল ফাতেমি খেলাফতেরই নিমকখোর নয় - খ্রিস্টানদের বেতনভোগী চরও বটে। মিসরীয়দের হৃদয়ে নপুংসক ফাতেমি খেলাফতের প্রতি সমর্থন এবং সুলতান আইউবির প্রতি ঘৃণা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে খ্রিস্টানরা পুষত তাকে।
‘জাতির বিবেক বলে খ্যাত কবিরা পর্যন্ত যখন শত্রুর বেতনভোগী, তখন জাতির জন্য অপমান ও লাঞ্ছনা অবধারিত।’ ক্ষুদ্ধকণ্ঠে বললেন আইউবি।
কক্ষে প্রবেশ করে দারোয়ান বলল- ‘ক্ষমতাচ্যুত খলীফা আল-আজেদের দূত সুলতানের  সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি প্রার্থনা করছেন।’
‘সুলতানের কপালে ভাঁজ পড়ে যায়। ক্ষণকাল কী যেন চিন্তা করে বললেন- ‘বৃদ্ধ আমার কাছে খেলাফত ছাড়া আর কি-ইবা চাইবে।’ দারোয়ানকে বললেন- ‘ওকে আসতে বলো’।
আজেদের দূত কক্ষে প্রবেশ করে বলল- ‘খলীফা আপনাকে সালাম জানিয়েছেন।’
‘তিনি তো এখন খলীফা নন। দুমাস হয়ে গেল আমি তাকে বরখাস্ত করেছি। এখন তিনি আপন প্রাসাদে আমার বন্দি।’ সুলতান বললেন।
‘অপরাধ মার্জনা করুন সুলতান। দীর্ঘদিনের অভ্যাস কিনা, তাই মুখ ফস্কে বেরিয়ে এল। আল-আজেদ সালামান্তে বলেছেন, তিনি গুরুতর অসুস্থ; বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না। কিন্তু আপনার সাক্ষাৎ তার একান্ত প্রয়োজন। বলেছেন, আমিরে মুহতারাম দয়া করে একটু এলে ভীষণ উপকার হবে।’ দূত বলল।




সংশ্লিষ্ট বই

পাঠকের মতামত
রিভিউ লিখুন
রিভিউ অথবা রেটিং করার জন্য লগইন করুন!